রাউজানে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত সেই `মাটির ঘর’

0
644
নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরফাত হোসাইন, রাউজান, চট্টগ্রামঃ  সময়টা ১৯৭০ সাল। নির্বাচনী কাজে চট্টগ্রামের রাউজানে এসেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দিনটি যেন রাউজানের জন্যে এক অতুলনীয় খুশির সংবাদ। চারিদিকে হইচই। মানুষের উল্লাস। অধীর আগ্রহ একনজর বঙ্গবন্ধুকে দেখা। সকাল থেকেই রাউজানে আনন্দের জোয়ার বইছে। কবে আসবে বঙ্গবন্ধু। কবে দেখবো আমরা। এই বুঝি এলো! অপেক্ষার প্রহর গুণছে সবাই, চেয়ে আছে নগরমূখী সড়কের পানে। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঢাকা হতে চট্টগ্রাম হয়ে দুপুরের সময় রাউজান আসলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পথের দু’ধারে মানুষ আর মানুষ। স্লোগানে মূখরিত পরিবেশ। মানুষের চোখে-মুখে যেন বিজয়ের হাসি।

বিকেলে রাউজান কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভা। প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু। তবে এর আগে যেতে চান তাঁর রাজনৈতিক বন্ধু রাউজান উপজেলার লেলাংগারা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ডা. একেএম আবু জাফরের বাড়িতে। কেননা, রাউজানে বঙ্গবন্ধু আসার পেছনে যার অসামান্য অবদান তিনি হলেন ডা. জাফর। গ্রামের মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে লেলাংগারা আসছেন বঙ্গবন্ধু। সাথে আছে তাঁর সফর সঙ্গীরাও। ইতোমধ্যে গ্রামে জানাজানি হয়ে গেছে বঙ্গবন্ধু আসছেন। বঙ্গবন্ধু আসবেন বলে ডা. জাফর গ্রামের মানুষের জন্যে মেজবানের আয়োজন করলেন। দুপুরের আহার মিয়া বাড়িতেই। এই যেন অন্যরকম অনুভূতি। বঙ্গবন্ধু পৌঁছার আগেই ডা. জাফরের মিয়া বাড়িতে যেন উপচে পড়া ভীড়। কিছুদুর পায়ে হেটে মিয়া বাড়ির ভীড় সামলে মাটির তৈরি একটি ঘরে প্রবেশ করলেন বঙ্গবন্ধু। সাথে আছেন ঢাকা-শহর থেকে আসা সঙ্গীরা।

দরজা-জানালা দিয়ে উকি দিচ্ছে লেলাংগারা গ্রামের সববয়সী মানুষেরা। শুধু একটু দেখার জন্যে বঙ্গবন্ধুকে। যেন বিশ্বাস করতে পারছে না বঙ্গবন্ধু এসেছেন তাদের গ্রামে। বঙ্গবন্ধুকে ছবি তোলছেন লেলাংগারা গ্রামের একজন লোক। নাম মো. ইউচুপ মিয়া।

সময় বেশি নেই, কেননা বিকেলে জনসভা। বঙ্গবন্ধু ডা. জাফরকে বললেন দেরি করা যাবে না। খাবার রেডি করতে হবে। হরেক-পদের খাবার দেয়া হলো অতিথিদের সামনে। পুরো একটি ছাগল রান্না করে সাঁজিয়ে বঙ্গবন্ধুর সামনে দিলেন। ডা. জাফরের আকুতি ছাগলের মাংস খেতেই হবে। তারাতারি খেতে শুরু করলেন সবাই। ওইদিকে রাউজান কলেজ মাঠে লোকজন আসা শুরু করেছে। খাওয়া শেষ হওয়া মাত্রই বঙ্গবন্ধু আর বসতে চাননা। ফিরবেন জনসভায়। মিয়া বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে আসা লোকজনকে বিদায় দিয়ে যাত্রা করেন জনসভার দিকে। হাজারও লোকের উপস্থিতিতে প্রধান বক্তার ভাষণ দিয়ে রাউজান-পাহাড়তলি সড়ক দিয়ে ফিরে যান চট্টগ্রামে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাউজানে আসাতে সে দিন মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন। আর যার কারণে মানুষ এত আনন্দিত হয়েছিলেন, যিনি না হলে হয়তো রাউজানে বঙ্গবন্ধুকে পেতেন না তিনি হলেন সত্তর দশকের আই স্পেশালিষ্ট বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. একেএম আবু জাফর। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া ডা. জাফর ৫২’র ভাষা আন্দোলনে চট্টগ্রামে ছাত্রদের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি চট্টগ্রাম জোনের মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। দায়িত্ব পালন করেন রেডক্রসের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আ.লীগের কোষাধ্যক্ষের। ১৯৭৫ সনে ২ ফ্রেব্রুয়ারী হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি।

রাউজানের লেলাংগারার গ্রামবাসীরা বঙ্গবন্ধু আসার স্মৃতিকে এখনও ভুলতে পারেন না। সেই দিনের স্মৃতিকে স্মরণ করে ডা. জাফরের স্ত্রী কামরুন নাহার জাফর বলেন, বঙ্গবন্ধুর আসার দিনটি এখনও চোখে ভাসে। কত আয়োজন, কত সাঁজসজ্জা চারিদিকে। পুরো মিয়া বাড়ি হেসেছিল। আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্যে সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলাম। বাহিরে মেজবান শুরু হয়েছে। আমার স্বামী প্রয়াত ডা. জাফরও উল্লাসিত ছিলেন।

সে দিন বঙ্গবন্ধুর সাথে সফর সঙ্গী হিসেবে এসেছিলেন, এম এ হান্নান, জহুর আহমেদ চৌধুরী, আমির হোসেন দোভাষ, জানে আলম দোভাষ, তোফায়েল আহমেদ, ইঞ্জি. মোশাররফ হোসেন, রাউজানের অধ্যাপক খালেদ, ডা. সুলতান আহমেদসহ রাজনৈতিক যোদ্ধারা।

লেলাংগারা গ্রামে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাত পাওয়া সালেহ আহমেদ বলেন, আমি সকাল থেকে মিয়া বাড়িতে ঘোরাঘুরি করেছি বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্যে। তিনি আসার পর জানালা দিয়ে উকি দিয়ে দেখেছি বাঙলার এই নেতাকে। ডা. জাফরের পরিবারের সদস্য একেএম মোসলেম ও রানা মিয়া বলেন, আমরা মনে করি বঙ্গবন্ধু এখানে আসা পুরো রাউজানের জন্যে গর্বের। রাউজানবাসী মনে রাখবে দিনটিকে। মাটির ঘরটি এখনও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছি। যাতে ঘরটি দেখেই বঙ্গবন্ধুর কথা মনে পড়ে।

#SmileNews #HA


নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here