রাউজানে স্ত্রীর জবানবন্দিতে নওমুসলিম স্বামী কারাগারে

0
749
নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মো. আরফাত হোসাইন, রাউজান, চট্টগ্রামঃ রাউজানের পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে ভালো লাগা শুরু হয় অভি দাশ (১৯) ও মোছাম্মৎ মেহেরুন্নেসা’র (১৬)। ভালো লাগা থেকে প্রেম। একসময় যা গভীর ভালবাসায় রুপ নেয়। দু’জন আর দু’জন ছাড়া থাকতে পারে না। এভাবে চলতে থাকে প্রেম। দুইজনের পরিচয় মানুষ হলেও অভি দাশের জন্ম হিন্দু পরিবারে আর মেহেরুন্নেসা জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুসলিম পরিবারে। অভি দাশ ও মেহেরুন্নেসার প্রেমের বয়স যখন দুই বছর পার হয়, এমন সময়ে মেহেরুন্নেসার পরিবারে বিষয়টি জানতে পারে।

মেহেরুন্নেসা রাউজান পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের মোবারকখীল এলাকার মুদার বাড়ির প্রবাসী আবু হেনা (প্রকাশ মানিকধন) ও জেসমিন আকতারের মেয়ে। অন্যদিকে অভি দাশ একই এলাকার (মোবারকখীল, ৯নং ওয়ার্ড) জলদাশ পাড়ার (জেলে পাড়া) সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মনোরঞ্জন দাশের ছেলে।

হিন্দু পরিবারের ছেলে অভি দাশের সাথে মেহেরুন্নেসার গভীর সম্পর্কের কথা মেহেরুন্নেসার মা জেসমিন আকতার জানতে পেরে চিন্তায় পড়ে যান। শেষে মেহেরুন্নেসার প্রবাসী পিতা আবু হেনার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন মেহেরুন্নেসাকে বিয়ে দেয়ার। বিয়ের প্রস্থাবও আসা শুরু করে। কিন্তু, মেহেরুন্নেসা অভি দাশকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না- জানিয়ে দেয় মা’কে। মুসলিম হয়ে হিন্দু ধর্মের সাথে বিয়ে যা ভাবতেও পারছিলেন মেহেরুন্নেসার মা জেনমিন আকতার। মেহেরুন্নেসাকে বিয়ের জন্যে পাত্রপক্ষের সাথে কথা-বার্তা বলা শুরু হয়।

মতের বিরুদ্ধে গিয়ে যখন বিয়ের কথা বার্তা শুরু হয়, আর কোন উপায় না পেয়ে গত ১৩ জুন সকাল ৯টায় মেহেরুন্নেসা ও অভি দাশ পালিয়ে যায়। যাবার সময়ে মেহেরুন্নেসা তাদের ঘরে থাকা ১ লক্ষ টাকারও বেশি নিয়ে যায়। প্রথমে চট্টগ্রাম শহরে, এরপর বান্দরবান গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে অভি দাশ হয়ে যায় আয়াত ইসলাম। আয়াত ইসলাম নামটি রাখেন মেহেরুন্নেসা। অভি দাশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরই দু’জনে বিয়ে করে (আগধ মাধ্যমে) বান্দরবান থেকে চন্দনাইশের রওশনহাটে এক রাত থেকে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতার বাড়ি চলে যান। সেখানে বাসা ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন। 

এদিকে মেহেরুন্নেসা ও অভি দাশ (আয়াত ইসলাম) পালিয়ে যাবার পর মেহেরুন্নেসার মা বাদি হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০ এর সংশোধনে ২০০৩ এর ৭/৩০ ধারায় রাউজান থানায় অপহরণ মামলা (মামলা নং ১৪, তারিখ ২২ জুন ২০২১) দায়ের করেন। 

মামলা দায়ের করার পর রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল-হারুন, পরিদর্শক (তদন্ত) কায়সার হামিদ তদন্ত শুরু করেন। অবশেষে প্রায় ২৫ দিন পর (৮ জুলাই) তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে উপ-পরিদর্শক অনুপম দাসের নেতৃত্বে সঙ্গীয় ফোর্সসহ মহেশখালীর মাতারবাড়ি শায়ের দিল নামক দুর্গম এলাকা থেকে ভিকটিম (মেহেরুন্নেসা) উদ্ধার ও অপহরণকারী অভি দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়।

থানায় নিয়ে আসার পর পুলিশের জেরায় দুইজনে মৌখিকভাবে ধর্মান্তরিত ও বিয়ের বিষয়টি জানালেও কোন ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেনি। মেহেরুন্নেসাকে অভিযুক্ত অভি দাশ অপহরণ করেছে কি-না জানতে চাইলে মেহেরুন্নেসা জানান, তাকে কেউ অপহরণ করেনি। অভি দাশকে ভালবাসে বলেই নিজ ইচ্ছায় দু’জনে পালিয়ে গেছেন। কেননা, বিয়ে হয়ে গেলে তার থেকে (অভি দাশ) দুরে থাকতে হবে। (রাউজান থানায় মেহেরুন্নেসার বলা কথাগুলোর ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে আছে)।  

পরদিন শুক্রবার (৯ জুলাই) ভিকটিম মেহেরুন্নেসা এবং আসামি অভি দাশকে চট্টগ্রাম আদালতে প্রেরণ করেন পুলিশ।

কিন্তু চট্টগ্রাম অতিরিক্ত চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোছাম্মৎ ফরিদা ইয়াসমিনের কাছে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ২২ ধারায় মেহেরুন্নেসা জবানবন্দী দেন- অভি দাশ তাকে বিয়ের প্রলোভনে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে।

মেহেরুন্নেসার জবানবন্দীর ভিত্তিতে আদালত অভি দাশকে কারাগারে প্রেরণ করে। বর্তমানে অভি দাশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। দু’জনে প্রেমের সম্পর্কে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলেও আদালতে মেহেরুন্নেসার জবানবন্দীতে ফেসে গেছেন অভি দাশ। 

এবিষয়ে কথা বলতে অভি দাশ ও মেহেরুন্নেসার বাড়িতে যায় প্রতিবেদক। অভি দাশের পিতা মনোরঞ্জন দাশ ও মাতা মুক্তা দাশ বলেন, তাদের ছেলের সাথে মুসলিম পরিবারের মেয়ের সম্পর্কের কথা জানতেন না। জানলে একাজ থেকে ছেলেকে বিরত রাখতেন। অভি দাশের পিতা বলেন, সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালায়। তিন ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছি। ওরা পালিয়ে যাবার পর আমাকেও কারাগারে যেতে হয়, পরে জামিনে বের হয়। এরপরও যদি ছেলে ওই মেয়ে চায় আমি আত্মহত্যা করবো। 

এদিকে মেহেরুন্নেসার বাড়িতে গেলে তাদের ঘর তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। প্রতিবেশিরা জানান, মেহেরুন্নেসা পালিয়ে যাবার পর থেকেই ওরা আর বাড়িতে নেই, হয়তো মেহেরুন্নেসার নানার বাড়িতে থাকেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মেহেরুন্নেসার এক মামা বলেন, মেহেরুন্নেসার মা অসুস্থ হাসপাতালে ভর্তি, কথা বলতে পারবেন না। মেহেরুন্নেসাকে ফোন দিতে বললে, তিনি বলেন, মেহেরুন্নেসাও মানসিকভাবে অসুস্থ। 

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল হারুন বলেন, রাউজানের পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ভিকটিম মেহেরুন্নেসা (১৬) কে বিবাদী রাম হরিদাশের ছেলে মনোরঞ্জন দাসের প্ররোচনায় তার ছেলে বিবাদী অভি দাশ ফুসলিয়ে অপহরণ করেছে মর্মে অপহরণ মামলা করেন তার মা জেসমিন আকতার। মামলার প্রেক্ষিতে আমরা মেহেরুন্নেসাকে উদ্ধার ও আসামি অভি দাশকে গ্রেপ্তার করি। বিধি মোতাবেক তাদের কোর্টে প্রেরণ করা হয়। সেখানে মেহেরুন্নেসার জবানবন্দীতে আসামি অভি দাশকে কারাগারে পাঠায় বিজ্ঞ আদালত। মামলাটি প্রক্রিয়াধীন আছেন।

#SmileNews #HA


নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here