শ্বশুরবাড়ি থেকে কুরবানি পশু নেওয়ার অসুস্থ সংস্কৃতি বন্ধ হোক

0
21
নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শ্বশুরবাড়ি থেকে কুরবানি পশু নেওয়ার অসুস্থ সংস্কৃতি বন্ধ হোক। কুরবানির পবিত্রতা রক্ষা হোকঃ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী 

চলছে জিলহজ্জ মাস। বায়তুল্লাহ শরীফ লাব্বাঈক আল্লাহুম্মা লাব্বাঈক ধ্বনিতে মুখরিত। কয়েক দিন পর শুরু হয়ে যাবে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। অন্যদিকে এ মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মের উৎস হলো ঈদুল আজহা। মুসলিম পরিবারে শুরু হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহার তোড়জোড়। ঈদুল আজহার প্রধান কাজ প্রভুপ্রেমে পশু কুরবানি দেওয়া। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে সামর্থবানরা পশু কুরবানি দিবেন। কুরবানি ঢালাউভাবে সকলের উপর ওয়াজিব নয়। যে ব্যক্তির উপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। অর্থাৎ বার্ষিক চাহিদা পূরণপূর্বক কুরবানির দিনগুলোতে (১০,১১,১২ জিলহজ্জ) যার কাছে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা সমান নগদ অর্থ অবশিষ্ট থাকে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। আল্লাহর রাস্তায় পশু কুরবানির মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে নিজের মধ্যে থাকা আমিত্ব, অহংকার ও পশুত্ব বিসর্জন দেওয়ার নামই কুরবানি। কুরবানি একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)’র নিরেট প্রভুভক্তির উজ্জ্বল উদাহরণ কুরবানি। মরুর দুলাল, আমাদের আ’কা (দ.) নিজের ও উম্মতের পক্ষ থেকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতি বছর কুরবানি দিয়ে আমাদেরকে ধন্য করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। কুরবানি পশুর বরকতময় গোস্ত পরিবার, আত্মীয়-স্বজনসহ গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটায়। প্রভুভক্তিতে নিবেদিত হয় সব আত্মা। করোনা মহামারির এ কঠিন পরিস্থিতিতেও পশু ক্রয়ে ব্যস্ত সামর্থবান মুসলমানরা। লোক দেখানো অথবা কারো মনোরঞ্জন করার জন্য কুরবানি দিলে সে কুরবানি কবুল হবে না। তারপরও আমাদের সমাজে দেখা যায় কুরবানি পশুর দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। চলে গরু-ছাগল বড়-ছোট নিয়ে তর্কাতর্কি। গরুর লড়াই। গোস্ত খাওয়ার আশায় বড় গরু দিয়ে কুরবানি দেওয়া। এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে চরম ঘৃণিত কাজ। এ সব কিছু উর্ধ্বে উঠে একমাত্র খোদাভীতি অর্জনের জন্য সানন্দে কুরবানি দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে অনেক মুসলিম পরিবারে। খুশির বাধ ভেঙেছে। আশার প্রহর গুনছে কখন ১০ই জিলহজ্জের সূর্যোদয় হবে। ঈদের নামাজান্তে কখন আল্লাহর রাস্তায় পশু কুরবানি দিবে একেবারেই তর সইছে না।

কিন্তু এ খুশির ছিটেফোঁটাও নেই কিছু পরিবারে। জিলহজ্জ মাস আসতেই মাথার উপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। যারা এ বছর মেয়ে বিয়ে দিয়েছে তারা ঈদুল আজহার খুশির চেয়ে ঢের চিন্তিত। একদিকে করোনা মহামারির ছোবলে তিমির অন্ধকারে জনজীবন। করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। চরম অনিশ্চয়তায় যাচ্ছে দিন। কখন যে স্বস্তির নতুন সূর্য উদিত হবে সবার অজানা। এসব কষ্ট সামান্যতমও রেখাপাত করছে না ছেলেকে নতুন বিয়ে করানো কিছু পিতা-মাতার অন্তরে। তারা দিব্বি খুশির ঢেকুর তুলে বউমাকে সমানে লজ্জা দিয়ে যাচ্ছে কখন বেয়াই বাড়ি থেকে তাদের ঘরে কুরবানি পশু আসবে? দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে তাগাদা দিচ্ছে বারবার। আরেকটু এডভান্স হয়ে বলছে পশুটা যেন গরুই হয়। ছাগল হলে চলবে না। গরুটা যেন বড় মোটাতাজা হয়। সমাজে যেন মুখ উজ্জ্বল হয় আমাদের। বড়মুখ করে যেন বলতে পারি, এটা আমার বেয়াই বাড়ি থেকে দিয়েছে। এমন সব অন্যায় আবদার করে বসে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন। মেয়ে বাড়ি থেকে ছেলে বাড়িতে কুরবানি পশু দেওয়া যেন ফরজে আইন! এ সব অন্যায় আবদার রক্ষায় অসহায় পিতা-মাতাকে হতে হয় নিঃস্ব।

নিজেদের কুরবানি করা সামর্থ নেই। তারপরও বেয়াই বাড়িতে কুরবানি পশু নেওয়ার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও হতে হচ্ছে ঋণগ্রস্ত। ঋণ না পেলে নিতে হয় সুদের ভিত্তিতে টাকা অথবা এনজিও থেকে কিস্তি! বেয়াই বাড়ির অন্যায় আবদার রক্ষা করতে ভিটা-মাটি হারানোর দৃষ্টান্তও কম নেই। কুরবানি পশু, মৌসুমি ফল, নাস্তা, উত্তম খাবার দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে ডিভোর্সের ঘটনাও অনেক। সব পরিবার এগুলো চাই তা কিন্তু নয়। অনেকে নিজের মেয়ে সম্মানের দিকে চেয়ে সাগ্রহে দেয়। নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সাগ্রহে দেওয়াটাও ভুল। এটা অন্যের জন্য উদাহরণ হয়ে যায়। ঐ বউয়ের বাড়ি থেকে দিতে পারলে, তোমার বাড়ি থেকে কেন দিতে পারবে না বলে দৃষ্টান্ত দেখায় কেউ কেউ।

নিঃসন্দেহে কুরবানি একটি পবিত্র ইবাদত। ত্যাগের মহান শিক্ষা এ কুরবানি। লোভী সম্প্রদায়ের বানানো বেয়াই বাড়িতে কুরবানির পশু দেওয়ার রীতি ত্যাগের বিপরীতে ভোগের রাজ্য কায়েমের কুশিক্ষা দেয়। এ অন্যায়, অপরাধ, অনিয়ম সমাজে চলতে চলতে একসময় অপরিহার্য নিয়মে পরিনত হয়ে যাওয়াটা কত বড় অভিশাপ তা একটি নিন্ম ও মধ্যবিত্ত পরিবারই ভালো জানেন। তাদের বোবাকান্না, অসহায় আত্মসমর্পণ যে কারো অন্তরে রেখাপাত করবেই। কুরবানির সুমহান শিক্ষা অম্লান করে দিচ্ছে এ কুপ্রথা।

যে মাসে জিহাদের চেয়েও ইবাদত অগ্রগণ্য। যে মাসে যুদ্ধবিগ্রহও হারাম। গরিবের সহায়, এতিমের বন্ধু নবী (দ.) যে মাসের প্রথম দশ দিন স্পেশাল ইবাদতের ঘোষণা দিয়েছেন। বেশি বেশি নফল আদায় ও রোজা রাখতে উৎসাহিত করেছেন প্রিয় উম্মতদের। সে মাসে মুসলিম পরিচয়ে শ্বশুরবাড়িকে চাপে ফেলে স্বার্থ হাসিল করা শুধু অমানবিকই নয়; বরং চরম অন্যায়। নতুন বিয়ে হওয়া ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে কুরবানি পশু না দেওয়ায় বউকে নির্যাতন করা বর্তমানে নিত্যকার সংবাদ। বিয়ের নতুন বছর মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কুরবানির পশু দেওয়ার অপরিহার্য রেওয়াজটা একটা অসামাজিকতাকে সামাজিকতা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা। প্রথম বছর ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে কুরবানির পশু নেওয়া রেওয়াজের নামে একটা নির্ঘাত অসুস্থ সংস্কৃতি। এটা যেমন সুস্থ সংস্কৃতির অংশ নয়, ঠিক তেমনি ইসলামও এ গর্হিত অপরাধকে মারাত্মকভাবে ঘৃণা করেন। কাউকে কষ্ট দিয়ে কিছু আদায় করা। চাপ দিয়ে কিছু নেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ইসলাম শান্তি, সম্প্রতি, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতার ধর্ম। সত্য-সভ্য কর্মময় ধর্ম ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে অনুপ্রাণিত করেছেন। সম্পর্ক ছিন্নকারীদের জন্য শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকাটা মদিনার ইসলামের থিউরি।

যেখানে দয়ার সাগর প্রিয় নবী (দ.) একজন পরহেজগার রমণীকে স্বামীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত বলে আখ্যায়িত করেছেন সেখানে সামান্য কিছু দেওয়া-নেওয়া নিয়ে স্ত্রীকে নির্যাতন করা নিঃসন্দেহে মহাপাপ। সচেতন মহলের কাছেও এটা বড় অন্যায়। রাষ্ট্রীয় আইনেও এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চাপ দিয়ে বেয়াই বাড়ি থেকে কুরবানির পশু নেওয়া যেমন ক্ষমা অযোগ্য অপরাধ, ঠিক একইভাবে নিজের অট্টালিকা টাকা আছে বলে ঢাকঢোল বাজিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কুরবানির পশু পাঠানোটাও চরম ভুল। কারণ আপনার বেয়াই বাড়িতে গরু দেওয়াটা অন্যের জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে যারা কুরবানি পশু দিতে অক্ষম তাদের মেয়েকে কটুবাক্য শুনতে হয়, লজ্জায় পড়তে হয়, নির্যাতনের স্টিমরোলার হজম করতে হয়।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা সমাজিক রীতি বলে চাপিয়ে দেওয়া এ অপরাধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলার এখনই মোক্ষম সময়। এ প্রতিবাদে প্রবীণদের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে নতুন প্রজন্মকে। আমরা প্রায় সকলেই এ সমস্যায় জর্জরিত। প্রায় সকলেই ভুক্তভোগী। কেউ লজ্জায় মুখ খুলছে না, কেউ বা আবার ভয়ে। এ সর্বনাশা কুপ্রথার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। মানুষকে বুঝাতে হবে এটা কোন রেওয়াজ নয়; বরং অন্যায়। এটা মাধ্যমে একপক্ষ লাভবান হয় আর অন্য পক্ষ হয় ক্ষতিগ্রস্ত। মসজিদের সম্মানিত খতিবদের এ বিষয়ে জুমার বয়ানে সাধারণ মানুষকে বুঝাতে হবে। জুমার বয়ান একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মানে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ইসলামি বক্তাদের আলোচনায় সমাজ সংস্কারমূলক বক্তব্য উঠে আসা সময়ের দাবী। যৌতুকের পাশাপাশি বছরজুড়ে মৌসুমি ফল, নাস্তা, কুরবানি পশু নেওয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে পাঠ্যবইয়ে প্রবন্ধ, নিবন্ধ থাকা যুক্তিযুক্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ সব কুপ্রথার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা তৈরি হলে আলোকিত জাতি গঠন হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকা, বিভিন্ন সাময়িকীতে এ সামাজিক অভিশাপের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। এ সামাজিক ব্যাধির প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধি, মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর হস্তক্ষেপ সমাজকে আলোর মুখ দেখাতে পারে।

করোনা মহামারি চেয়েও ভয়ংকর এ সামাজিক ব্যাধি যৌতুক। করোনা একদিন চলে যাবে। চিরচেনা রূপে ফিরে যাবে এ অপরূপ সৃষ্টি। কিন্তু এ যৌতুক মহামারি আমাদের উদাসিতা, অবহেলা, অসচেতনতা ও কঠোর-কঠিন প্রতিবাদের অভাবে আমাদের মন-মগজে রাজত্ব করবে যুগ যুগ ধরে। সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিবে। মনে রাখবেন কারো একার পক্ষে এ সামাজিক দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়। আমার এ প্রবন্ধ কখনোই এ চরম অন্যায়কে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু আমার বিশ্বাস মানুষের মনে নাড়া দিতে পারবে। এ নাড়িয়ে দেওয়াটাই আমার সফলতা। এ গর্হিত অপরাধের বিরুদ্ধে সমস্বরে আওয়াজ তুলতে হবে। আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি। যৌতুক নেবো না, দেবোও না। আমার একজনের দ্বারা কী হবে, এ ভাবনায় ঘুমিয়ে থাকা বীরের কাজ নয়। একজন জেগে লক্ষজনের ঘুম ভাঙানোই হবে প্রকৃত বীরের কাজ। আসুন আমি সচেতন হই, এ কুপ্রথার বিরুদ্ধে সচেতন করি অন্যকে। আসুন এ মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে একে অন্যের পাশে থেকে এ কঠিন সময় অতিক্রম করি। শ্বশুরবাড়ি থেকে কুরবানি পশু না চেয়ে কিংবা না নিয়ে; বরং নিজে সামর্থবান হলে গোপনে আত্মীয়-স্বজনের পাশে দাঁড়ানোই হলো সহমর্মিতা। রাসুলে পাক (দ.)’র সুন্নাত অনুসরণপূর্বক হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)’র অকৃত্রিম প্রভুভক্তি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, সুপ্রিম সেক্রিফাইজ পবিত্র কুরবানি আমাদের জীবনকেও ত্যাগের মহিমায় উদ্বেলিত ও উদ্ভাসিত করুক।

লেখকঃ
প্রাবন্ধিক ও সংগঠক
সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
খতিব- ওসমান চৌধুরী জামে মসজিদ, চট্টগ্রাম।  


নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here