হালদায় ডলফিন হত্যা রোধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী

0
13
ছবিঃ হালদা নদী থেকে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মৃত ডলফিনের দৃশ্য।
নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিন বছরে হত্যাকান্ডের শিকার ২৭টি ডলফিন!

নিজস্ব প্রতিবেদক  দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে একের পর এক ডলফিন হত্যাকান্ডের শিকার হলেও এখনো পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জোরদার করা হয়নি। অতি বিপন্ন প্রজাতির এই জলজ প্রাণীটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। বিষয়টি দেখবালের দায়িত্ব বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের। ডলফিনের মৃত্যুর কারণ খোঁজা, লোকদেখানো অভিযান ছাড়া কার্যকর কোন প্রদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যদিওবা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ বলছে, এখন থেকে ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। আগামীতে কয়েকটি গ্রুপের মাধ্যমে প্রতি দুইদিন পর অভিযান চালানো হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ২৭টি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রয়াই মৃত ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সর্বশেষ গত ১২ অক্টোবর মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাউজান উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের আজিমের ঘাট এলাকা থেকে মৃত একটি ডলফিন উদ্ধার করা হয়। ক্ষত-বিক্ষত মৃত ডলফিনটির দৈর্ঘ্য ৪৬ ইঞ্চি। হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারীসহ সচেতন মহল জানান, বালুবাহী ড্রেজার, ইঞ্জিনচালিত নৌ-যান আর জাল পাতা সম্পূর্ণ বন্ধ করা না গেলে ডলফিন হত্যারোধ সম্ভব নয়। ইঞ্জিন চালিত নৌযান চলাচল বন্ধ করতে হলে নৌ-থানা স্থাপন জরুরী বলে মনে করছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে কথা বললে রাউজান উপজেলা সি. মৎস্য কর্মকর্তা পীযুষ প্রভাকর বলেন, ডলফিন হত্যার বিষয়টি আমাদের মৎস্য বিভাগ তদারকি করেনা। এটি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কাজ। হালদার জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় নৌ-থানা স্থাপনের জন্য নদী পাড়ের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের যে দাবি সে বিষয়ে অগ্রগতি কতটুকু? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন নৌ-থানা স্থাপনের জন্য প্রস্তাবনাও পাঠানো হয়েছিল। নৌ-থানা হচ্ছে না, হালদা নদীর হাটহাজারী অংশে একটি নৌ পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন বস্তবায়নাধীন আছে। আশাকরছি আগামী মার্চে এটি বাস্তবায়ন হবে।

হালদা নদীতে একের পর এক ডলফিন হত্যার পর প্রয়োজনী প্রদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা তা জানার জন্য বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ’র চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিব করেননি।

পরে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ চট্টগ্রাম জেলার ওয়াইল্ড লাইফ রেঞ্জার মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, হালদা নদীতে অবৈধভাবে পাতানো জালে আটকে ডলফিন মারা যাচ্ছে। আমরা উপজেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় গত ১৯ অক্টোবর বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা অভিযান চালিয়ে ২ হাজার মিটার জাল জব্দ করেছি। দুইজনকে সতর্ক করেছি। জালে আটকে ডলফিনের মৃত্যু হলে আঘাতের চিহ্ন কেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন আমরা ইঞ্জিন চালিত নৌকার বিষয়েও তাদারকি করছি। তিনি আরও বলেন, হালদা নদীর ডলফিন রক্ষায় আমাদের আলাদা কোন প্রকল্প নেই। একটি এনজিও সংস্থা কাজ করছে। তবে তারা শুধুমাত্র ডলফিনের জন্য না মা-মাছ রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেখবাল করে থাকে। তিনি আরও জানান, আগামীতে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বিশ্বের যত প্রাণী ঝুঁকির মুখে এই ডলফিন তাদের অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী ডলফিনের জন্য অন্যতম আবাসস্থল। তারা নিরাপদেই ছিল। তাদের সংখ্যাও ভালো ছিলো। গত ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত তিন বছরে ২৭টি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া মৃত ডলফিনগুলো মাছ ধরার জালে আটকে, হালদা নদীতে চলাচলরত ড্রেজার, ইঞ্জিনচালিত নৌযান আর মৎস্য শিকারীদের অপতৎপরতায় মারা গেছে বলে ধারণা করছি। উদ্ধার হওয়া প্রায়ই ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রশাসনের তৎপরতায় হালদা নদীতে জালপাতা রোধ আর বালুবাহী ড্রেজারের চলাচল আগের তুলনায় অনেক কমেছে। তবুও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে যে ড্রেজার, নৌযান আর অধৈব জালপাতা হচ্ছে মূলত সেই কারণেই ডলফিনের মৃত্যুরোধ হচ্ছেনা। প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি হালদার আশপাশের মানুষ সচেতন হলেই হালদা তার ঐতিহ্য আবার ফিরে পাবে।

তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সাল থেকে আমরা বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে হালদায় ১৭০টি ডলফিনের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি ধারণা করছি। তবে গত তিন বছরে ২৭টির মৃত্যু হলেও ডলফিনের প্রজনন কি পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে সে সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছিনা। তবে মৃত্যুর পাশাপাশি গত তিন বছরে ডলফিনের প্রজননও অবশ্যই বেড়েছে।

এই প্রসঙ্গে রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগ বলেন, হালদা নদীর জীব-বৈচিত্র্য তথা ডলফিন রক্ষায় রাউজান উপজেলা প্রশাসন তৎপর রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মহোদয় ও রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী মহোদয়ের পরামর্শক্রমে আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ জালপাতা রোধ ও ইঞ্জিন চালিত নৌযান চলাচল বন্ধ ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ রেখেছি। সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর অভিযান চালিয়ে ২ হাজার মিটার অবৈধজাল জব্দ করা হয়েছে। এর আগে বালুবাহী ইঞ্জিন চালিত নৌযান ধ্বংস করেছিলাম। হালদা নদীতে যারা অপরাধ তৎপরতা চালিয়ে কেউ পার পাবেনা।

প্রসঙ্গত, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর নাজিরহাট থেকে হালদা নদীর মোহনা কালুরঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫৩ কিলেমিটার দৈর্ঘ্য নদীতে সারাবছর মাছ শিকার, বালু উত্তোলন, ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে।

#SmileNews #HA


নিউজটি শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here